রমযানের গুরুত্বপূর্ণ চার শিক্ষা, না জানলে জেনেনিন

বুধবার, মে ২৯, ২০১৯ ৭:২৮ অপরাহ্ণ

রমযান মাস রহমত, বরকত ও মাগফেরাতের মাস। (সহীহ বুখারী) এ মাসে পবিত্র কোরআন নাজিলের মাধ্যমে মানব জাতির জন্য যেমন ইসলামকে একটি জীবন বিধান নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে তেমনি এ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করা হয়েছে।

(সুরা আল মায়েদা : ০৩) আমরা যারা এ বছর এ মাস পেয়েছি জানিনা আগামী বছর আমরা তা পাব কিনা? আমাদের আশেপাশে লক্ষ্য করলেই এ সত্যতা সহজেই উপলব্ধি করতে পারব। এ মাসকে আমরা যথাযথ কাজে লাগাতে পারছি কিনা তা আমরা নিজেরা এবং আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

হাদীসে এসেছে, যখন জিব্রাইল (আ.) বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি রমযান মাস পেল কিন্তু তার গুণাহসমূহ মাফ করে নিতে পারল না সে ধ্বংস হোক তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমিন্।’ (সহিহ বুখারী) সুতরাং রমযান মাসের এ সুযোগ যাতে যথাযথভাবে আমরা কাজে লাগাতে পারি তার জন্য যথেষ্ট সজাগ থাকতে হবে।

তবুও আমরা প্রত্যাশা করি আল্লাহ আমাদেরকে এ মাস হতে যথাসম্ভব শিক্ষা নিয়ে অন্যান্য মাসগুলোতে নিজেদেরকে পরিচালিত করতে পারি সে তৌফিক দান করুন। রমযানের অনেকগুলো শিক্ষণীয় বিষয় আছে। তার মধ্য থেকে আমাদের দেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ চারটি বিষয়ের আলোচনা অতি সংক্ষেপে পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো-

এক. আল্লাহর একত্ববাদের দর্শনঃ রোযার মধ্য দিয়ে প্রকৃতভাবে আল্লাহর একত্ববাদের দর্শন, অস্তিত্বের দর্শন অনুভব করা যায়। আর তা হলো, দুনিয়ার কেউ আমাদেরকে না দেখলেও আল্লাহ দেখবেন এ বিশ্বাসে ক্ষুধা, তৃষ্ণায় আমরা কিছুই খাই না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি এমনভাবে ইবাদত করবে যেন, তুমি আল্লাহকে দেখছো, যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে মনে করবে, তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (বুখারী) সুতরাং এ অভ্যাসটা যেন শুধুমাত্র রমযান মাসে না হয়ে অন্যান্য প্রত্যেক মাসে প্রত্যেক কাজে আমাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় সে শপথ আমাদেরকে নিতে হবে।

দুই. যাকাত ও উশরঃ যাকাত দেয়ার উত্তম সময় রমযান মাস। তবে সে যাকাত নিতে যেয়ে যদি নিরীহ মানুষের জীবন দিতে হয় তাহলে তা কেমন করে ইসলামী বিধান হয়? সুতরাং এই যে প্রথা এটা শরীয়ত সম্মত না। এভাবে যাকাত আদায় করলে যাকাত আদায় হবে না। আর একটা বিষয়, যাকাতের শাড়ি বা লুঙ্গি বলে কিছু নেই।

বরং রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঐ ব্যক্তি কখনই মু’মিন হিসেবে সাব্যস্ত হবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বুখারী) মনে রাখা দরকার যাকাত ধনীদের সম্পত্তিতে গরীবের হক; অধিকার। (সূরা আল যারিয়াত : ১৯) তাদের হক তাদের কাছে সম্মানের সাথে পৌঁছে দিতে হবে।

আর একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা যারা যাকাত আদায় করি তারাও বেমালুমভাবে উশর (ফসলের যাকাত যা প্রাকৃতিকভাবে হলে এক দশমাংশ আর ব্যয়ের মাধ্যমে হলে বিশভাগের একভাগ যাকাতের খাতগুলোতেই বণ্টন করতে হবে) এর কথা ভুলে যাই। আমাদের দেশ শুধু নয়; বরং বিশ্বের অধিকাংশ দেশে উশর একটি উপেক্ষিত ইবাদত।

যা মোটেও কল্যাণকর নয়। তাছাড়া, এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দিন তারিখ, সময় ও স্থান উল্লেখ করে, মাইকিং করে, সাংবাদিকদের ডেকে এনে মিডিয়াতে প্রচারের নিমিত্বে যাকাত আদায় করলে এর ফরয আদায় হলেও আল্লাহর নিকট ইবাদত হিসেবে গ্রহণীয় হবে না। এটা লোক দেখানো ইবাদতের মত। সে ব্যক্তির জন্য ধ্বংস অনিবার্য। যাকাত একটি ইবাদত যা হতে হবে যথাসম্ভব গোপনে। প্রচারের উদ্দেশ্যে তো নয়ই।

তিন. সদকাতুল ফিতরঃ সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ ৬০-১৬৫০ টাকা বা এরূপ হয়ে থাকে। একবার ভাবুনতো এত পার্থক্য কেন? কারণ হলো যাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করা হয় মৌলিক তিনটি খাদ্যবস্তুর উপর ভিত্তি করে। যথা: আটা, যব এবং খেজুর। এ তিনটি বস্তুর বাজার মূল্য ভিন্ন হওয়ায় ফিতরার পরিমাণটাও ভিন্ন হয়। তবে, এ ভিন্নতায় আপনার আমার ফিতরা কিভাবে বিবেচ্য হবে এটা ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল।

উদাহরণ, হিসেবে বলা যায় বাজারে ভিন্ন ভিন্ন কোয়ালিটির খেজুর পাওয়া যায় যার মূল্যও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন : ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০০ টাকা। এখন ফিতরাদাতা যে কোয়ালিটির খেজুর সচরাচর নিজে এবং নিজের পরিবারের জন্য কিনে থাকে ঐ রকম মূল্যমানের উপর ভিত্তি করে তার ফিতরার পরিমাণ হওয়া কি উচিত নয়?

তাছাড়া আপনার পাশের লোকদের দিকে তাকান। কত রকমের বড়লোক আছে। যাকাত ফরয হয়েছে এমন লোকদের মধ্যেও এরকম কম ও বেশি সম্পদের মালিক আছে। সুতরাং কার কেমন পরিমাণ সম্পদ আছে, অথবা তার লাইফস্টাইল কেমন তার উপর ভিত্তি করে যাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। সবার জন্য ৬০ টাকা নয়; বরং কারো জন্য ৭০/৮০/৯০/১৫০/১০০০/১৬৫০ টাকা এভাবে দিতে হবে। এটা আপনার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

কেননা, ‘প্রত্যেক কাজের প্রতিদান তার নিয়তের উপর।’ (বুখারী ও মুসলিম)। সুতরাং যাকাতুল ফিতর আদায়ের সময় একবার ভাবুন আপনার জন্য কতটাকা মানানসই। আর দেয়ার ক্ষেত্রে সূরা তওবাহের ৬০ নম্বর আয়াতের আলোকে ধারাবাহিকভাবে খাতগুলো লক্ষ্য রাখুন। তবে, অবশ্যই যে কোনো খাতের নিকটজনরা; নিকট আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশীরা বেশি অগ্রাধিকারী হবেন।

চার. ঈদের নামায এবং তার শরয়ী উদ্দেশ্যঃ ঈদের অনেকগুলো শরয়ী উদ্দেশ্য আছে। তার মধ্যে একটি পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলা। প্রত্যেকটা নামাযের ক্ষেত্রে একেক ধরণের বিধান আছে। তেমনি, ঈদের নামাযের বিধান হলো তা খোলা জায়গায় এবং বৃহৎ আকারের হতে হবে। তবে, শরয়ী ওযর যেমন, বৃষ্টি-বাদল বা এমন কোনো পরিস্থিতি যে অবস্থায় খোলা জায়গায় নামায আদায় করা সম্ভব নয় এমন সময় মসজিদে আদায় করা যাবে।

এখন লক্ষ্যণীয় যে, আমরা যে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রত্যেক মসজিদের পাশে কিংবা ভিতরে ঈদের জামাত করি তা কি আদায় হবে? একবার ভাবুন, শারে বা বিধানদাতা চান আমরা অন্তত বছরে একবার হলেও মিলিত হই, দেখা-সাক্ষাত করি, খোঁজ-খবর নেই একে অপরের যাতে করে আমাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বিদ্যমান থাকে।

এমনকি রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যেতে, এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসতে। এটি সুন্নত। যাতে প্রতিবেশীদের খোঁজ নেয়া বা তাদের সাথে সাক্ষাত করা সহজ হয়। কিন্তু আমরা কী করছি? এভাবে নামায আদায় হবে না, হবে না শারে বা বিধানদাতার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন। তাই ভাবুন, আপনি কি আপনার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবেন না আল্লাহর যিনি আমাদেরকে খোলা জায়গায় বৃহৎ আকারে নামায আদায়ের বিধান করেছেন? বিশেষ করে, গ্রামাঞ্চলের মসজিগুলোর ইমাম সাহেবরা এবং কমিটির সদস্যরা এ ব্যপারে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করতে পারে।

এমনও দেখা যায়, ছোট্ট একটা মসজিদ নয়, পাঞ্জেগানা সেখানেও ঈদের জামাত হচ্ছে। বিশেষ কোনো শরয়ী ওজর না থাকলে নামায আদায় হবে না। তাই, বিশেষ করে প্রত্যেক গ্রামের মসজিদগুলোকে সমন্বিত করে একটা ঈদগাহে যদি নামায আদায় করা যায়, তাহলে শরীয়তের উদ্দেশ্য অনেকাংশে সাধিত হবে বলে বিশ্বাস। সেক্ষেত্রে, বড় জায়গার অভাব হলে, একাধিক জামাত করাতে কোনো অসুবিধা নেই।

পরিশেষে এ কথা আমাদের মনে রাখা দরকার যে, শরীয়তের প্রত্যেকটা বিধানের পিছনে যেমন হিকমত আছে তেমনি আছে বিশেষ কিছু উদ্দেশ্য যা পার্থিব ও পরকালীন জীবনের কল্যাণের উপায় মাত্র। এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত যিনি আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতসহ সকল কল্যাণ অকল্যাণ সম্পর্কে অবহিত। আর তাই সেসব বিধানগুলোকে যেভাবে আদায়ের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেগুলোকে যথাসম্ভব সেভাবেই আদায় করতে হবে।

নিজেদের দূর্বলতা আর হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে যেয়ে শরয়ী বিধানের উদ্দেশ্য যদি ব্যাহত হয় তাহলে সেসব ইবাদতের যেমন কোনো মূল্য থাকবে না তেমনি আমরা দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে এমন ক্ষতির সম্মুখীন হব যার থেকে পরিত্রাণের কোনো সুযোগ আর থাকবে না। সুতরাং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে আমাদের কামনা-বাসনা হলো তিনি যেন আমাদেরকে তার দেয়া শরয়ী বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এবং সেসব বিধানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হাসিল করতে তৌফিক দান করেন। আমিন।

লেখক: সহকারি অধ্যাপক, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিporiborton